সন্ধ্যা নদীতে ঢাক-ঢোলের তালে উজিরপুরে নৌকা বাইচ ২০২৫—উচ্ছ্বাসে মুখর দুই তীর
- প্রকাশের সময়: ০৭:৪৫:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৫ ১৩৩ জন পড়েছে
গ্রামবাংলার প্রাণের উৎসব, নদীর বুকে ঢাক-ঢোল আর বাঁশির তালে তালে আজ উজিরপুরে ফিরে এল সেই হারানো ঐতিহ্য-নৌকা বাইচ। বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর ২০২৫) বিকেল ৫টায় শিকারপুর সরকারি শেরে বাংলা ডিগ্রি কলেজের সামনের সন্ধ্যা নদীতে অনুষ্ঠিত হয় বহুল প্রতীক্ষিত “উজিরপুর নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা ২০২৫”। প্রতিযোগিতা শুরু হয় শিকারপুর কলেজ ঘাট থেকে এবং শেষ হয় সেক্টর কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর এম.এ জলিল সেতু পর্যন্ত দীর্ঘ নদীপথে।
এই প্রাণবন্ত আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন বরিশাল জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বরিশাল জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন এবং বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের জনশিক্ষা বিভাগের কীপার আসমা ফেরদৌসী। অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করেন উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আলী সুজা।
আয়োজনটি যৌথভাবে করেছে উজিরপুর উপজেলা প্রশাসন ও উন্নয়ন সংস্থা আভাস (AVAS), আর্থিক সহায়তায় ছিল বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর (ইউনেস্কো সহযোগী প্রতিষ্ঠান)।
এ বছর মোট ৬টি বাচারি নৌকা অংশ নেয়, যেগুলোর নামকরণ করা হয়েছে দেশের ইতিহাস, সাহিত্য ও মুক্তিযুদ্ধের বীর সন্তানদের নামে। প্রতিযোগী দলগুলো হলো-
১. শের-ই-বাংলা এ.কে. ফজলুল হক,
২. কবি জীবনানন্দ দাশ,
৩. মেজর এম.এ জলিল,
৪. বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর,
৫. কবি সুফিয়া কামাল,
৬. জুলাই যোদ্ধা।
নৌকাগুলো পরিচালনায় অংশ নেন গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুর জেলার অভিজ্ঞ মাঝি ও প্রতিযোগীরা-কালিপদ তালুকদার, লাজারেজ ফলিয়া, কিরণ মৃধা, সঞ্জয় রায়, শংকর বাড়ৈ ও সৈকত রায়, যাঁরা নিজ নিজ দলকে নেতৃত্ব দেন দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে।
প্রতিযোগিতা শেষে মেজর এম.এ জলিল সেতুর ইচলাদী প্রান্তে অনুষ্ঠিত হয় পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। সেখানে বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় চ্যাম্পিয়ন, ১ম রানার আপ, ২য় রানার আপ পুরস্কার এবং বিশেষ সম্মাননা।
🏆 ফলাফল:
চ্যাম্পিয়ন: শের-ই-বাংলা এ.কে. ফজলুল হক দল
১ম রানার আপ: মেজর এম.এ জলিল দল
২য় রানার আপ: জুলাই যোদ্ধা দল
প্রধান অতিথি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, “নৌকা বাইচ আমাদের জাতির ঐতিহ্য ও ইতিহাসের এক উজ্জ্বল প্রতীক। এটি শুধু বিনোদন নয়, বরং একতা, শৃঙ্খলা ও দলগত মনোভাবের প্রতিফলন। উজিরপুরের নদী আজ যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে মানুষের উচ্ছ্বাসে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন উৎসবকে সবসময় উৎসাহিত করা হবে।”
বিশেষ অতিথি আসমা ফেরদৌসী বলেন, “বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণে কাজ করছে। উজিরপুরের এই নৌকা বাইচ সেই সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণের জীবন্ত উদাহরণ। নতুন প্রজন্ম এই আয়োজনের মাধ্যমে আমাদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।”
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন বলেন, “সন্ধ্যা নদীর দুই তীরে আজ লক্ষাধিক মানুষের ঢল প্রমাণ করে, গ্রামীণ সংস্কৃতি এখনো আমাদের জীবনের গভীরে প্রোথিত। নৌকা বাইচ শুধু প্রতিযোগিতা নয়, এটি মানুষের মিলনমেলা ও সামাজিক ঐক্যের প্রতীক।”
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও অনুষ্ঠানের সভাপতি মোঃ আলী সুজা বলেন, “উজিরপুরের মানুষ আজ তাদের নদীমাতৃক সংস্কৃতিকে নবজীবন দিয়েছে। আমাদের লক্ষ্য শুধু বিনোদন নয়, তরুণ প্রজন্মের কাছে বাংলার ঐতিহ্য তুলে ধরা। ভবিষ্যতেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন আয়োজন অব্যাহত থাকবে।”
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি এস.এম. আলাউদ্দিন, পৌর বিএনপির সভাপতি মোঃ শহীদুল ইসলাম খান, পৌর যুবদলের আহ্বায়ক শাহাবুদ্দিন আকন সাবু, পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মেহেদী হাসান ভুইঁয়া, এবং উপজেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শত শত নেতাকর্মী ও হাজার হাজার উৎসুক জনতা।
দর্শক, অতিথি ও প্রতিযোগীদের উপস্থিতিতে সন্ধ্যা নদীর দুই তীরে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। নদীর বুকে ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাজে ঢাকের আওয়াজ, ভেসে আসে “জয় বাংলা” ধ্বনি-যেন ফিরে এসেছে গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া প্রাণচাঞ্চল্য।
অতিথিদের ভাষায়, “আজকের এই নৌকা বাইচ প্রমাণ করে, নদী ও নৌকা এখনো আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এমন আয়োজন মানুষকে মিলিত করে, শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেয়।”






