ঢাকা ০৪:১৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

উজিরপুরের সাতলায় নেছারিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ও বাণিজ্যের অভিযোগ

নুরুল ইসলাম আসাদ (জ্যেষ্ঠো প্রতিবেদক)
  • প্রকাশের সময়: ০৮:৪০:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১০৪ জন পড়েছে

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলায় নেছারিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগকে ঘিরে একাধিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এবিএম জাহিদ হাসান, মাদ্রাসার সুপারিন্টেন্ডেন্টসহ নিয়োগ কমিটির বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ ও প্রার্থীদের বঞ্চিত করার মতো গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এমনকি নারী শিক্ষকদের সাথে অসদাচরণ ও হয়রানির মতো অভিযোগও উঠেছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

ভুক্তভোগী চাকরিপ্রার্থী মো. অলিউল ইসলাম জানান, চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে নেছারিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপারিন্টেন্ডেন্ট তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে নগদ টাকা নেন। এছাড়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের অধীনস্থ একাডেমিক সুপার সুমন চৌধুরী তাঁর কাছ থেকে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নাম করে ১০ (দশ) হাজার টাকা নেয়। তবে, কিছুদিন পর সেই টাকা সুমন চৌধুরী ফেরত দিয়ে দেয়। নিয়োগ পরিক্ষায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পরিক্ষার হলে পরিক্ষা চলাকালীন  সময়ে উপস্থিত থেকে নিয়োগ পরিক্ষা তদারকির কথা থাকলেও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এবিএম জাহিদ তা না করে, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে নিজ বাসায় থেকে মাদ্রাসার সুপারিন্টেন্ডেন্ট পরিক্ষার ফলাফল সীটে স্বাক্ষর নেন; যা অবৈধ পরিক্ষার বৈধতা দেওয়ার সামিল মাত্র। আর নিয়োগ পরিক্ষাটি ছিল নিছক একটি নাটক।
এ বিষয়ে দি বাংলাদেশ টুডে’র প্রতিনিধি জানতে চাইলে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এবিএম জাহিদ বিষয়টি স্বীকার করে নেন।

এদিকে অলিউল ইসলাম আরও জানান, তিনি লিখিত পরিক্ষায় সর্বোচ্চ নাম্বার পান, অথচ বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ নিবাসী আলামিন নামক এক ব্যাক্তির কাছ থেকে উক্ত মাদ্রাসার সুপারিন্টেন্ডেন্ট, মদ্রাসার কমিটির বিদ্যুসায়িত সদস্য মোঃ ইয়াছিন, সদস্য সোহাগ ও জামালাসহ আরও কয়েকজন মিলে নগদ ২ (দুই) লক্ষ টাকা ঘুষ নিয়ে আমাকে বাদ দিয়ে তাকে নিয়োগ দেওয়ার সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করেন।।

অন্যদিকে অলিউল ইসলাম অভিযোগ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিতভাবে আবেদন করেন, যার ভিত্তিতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে তদন্তের শেষ দিকে অভিযোগকারী জানতে পারেন, দুর্নীতিতে তদন্ত কমিটির কয়েকজনও জড়িত থাকায় প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন। ফলে তিনি ঢাকায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালকের কাছেও অভিযোগ দাখিল করেছেন।

প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, এবিএম জাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে আগেও অভিযোগ উঠেছিল। ২০২২ সালের ২৬ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল। তবে অজ্ঞাত কারণে সেই সময়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বহু বছর ধরে একই কর্মস্থলে বহাল রয়েছেন। অথচ সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী একই জায়গায় একটানা তিন বছরের বেশি কর্মরত থাকার সুযোগ নেই। শিক্ষক ও অভিভাবকরা মনে করছেন, দুর্নীতির নিরাপদ ক্ষেত্র তৈরি করতেই তিনি উজিরপুর ছাড়ছেন না।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক-শিক্ষিকা জানিয়েছেন, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আর্থিক লেনদেন ছাড়া কোনো নিয়োগ বা প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেন না। বিভিন্ন মিটিংয়েও শিক্ষকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করেন। নারী শিক্ষিকাদের তিনি একান্তে ডেকে এনে ব্যক্তিগতভাবে হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ আড়াল করতে তিনি প্রায়ই বলে বেড়ান যে তাঁর ছেলে সেনাবাহিনীর একজন মেজর পদমর্যাদার কর্মকর্তা।

এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা জানান, “বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। যথাযথ প্রমাণ পাওয়া গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হবে এবং তারাই এর উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন।”

স্থানীয়রা বলছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা রক্ষা ও দুর্নীতির দৌরাত্ম্যের লাগাম টানতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায় মেধাবী প্রার্থীরা বঞ্চিত হবেন এবং শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা বেড়ে যাবে।

নিউজটি শেয়ার করে সকলকে জানিয়ে দিন

মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

উজিরপুরের সাতলায় নেছারিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ও বাণিজ্যের অভিযোগ

প্রকাশের সময়: ০৮:৪০:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলায় নেছারিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগকে ঘিরে একাধিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এবিএম জাহিদ হাসান, মাদ্রাসার সুপারিন্টেন্ডেন্টসহ নিয়োগ কমিটির বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ ও প্রার্থীদের বঞ্চিত করার মতো গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এমনকি নারী শিক্ষকদের সাথে অসদাচরণ ও হয়রানির মতো অভিযোগও উঠেছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

ভুক্তভোগী চাকরিপ্রার্থী মো. অলিউল ইসলাম জানান, চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে নেছারিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপারিন্টেন্ডেন্ট তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে নগদ টাকা নেন। এছাড়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের অধীনস্থ একাডেমিক সুপার সুমন চৌধুরী তাঁর কাছ থেকে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নাম করে ১০ (দশ) হাজার টাকা নেয়। তবে, কিছুদিন পর সেই টাকা সুমন চৌধুরী ফেরত দিয়ে দেয়। নিয়োগ পরিক্ষায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পরিক্ষার হলে পরিক্ষা চলাকালীন  সময়ে উপস্থিত থেকে নিয়োগ পরিক্ষা তদারকির কথা থাকলেও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এবিএম জাহিদ তা না করে, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে নিজ বাসায় থেকে মাদ্রাসার সুপারিন্টেন্ডেন্ট পরিক্ষার ফলাফল সীটে স্বাক্ষর নেন; যা অবৈধ পরিক্ষার বৈধতা দেওয়ার সামিল মাত্র। আর নিয়োগ পরিক্ষাটি ছিল নিছক একটি নাটক।
এ বিষয়ে দি বাংলাদেশ টুডে’র প্রতিনিধি জানতে চাইলে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এবিএম জাহিদ বিষয়টি স্বীকার করে নেন।

এদিকে অলিউল ইসলাম আরও জানান, তিনি লিখিত পরিক্ষায় সর্বোচ্চ নাম্বার পান, অথচ বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ নিবাসী আলামিন নামক এক ব্যাক্তির কাছ থেকে উক্ত মাদ্রাসার সুপারিন্টেন্ডেন্ট, মদ্রাসার কমিটির বিদ্যুসায়িত সদস্য মোঃ ইয়াছিন, সদস্য সোহাগ ও জামালাসহ আরও কয়েকজন মিলে নগদ ২ (দুই) লক্ষ টাকা ঘুষ নিয়ে আমাকে বাদ দিয়ে তাকে নিয়োগ দেওয়ার সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করেন।।

অন্যদিকে অলিউল ইসলাম অভিযোগ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিতভাবে আবেদন করেন, যার ভিত্তিতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে তদন্তের শেষ দিকে অভিযোগকারী জানতে পারেন, দুর্নীতিতে তদন্ত কমিটির কয়েকজনও জড়িত থাকায় প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন। ফলে তিনি ঢাকায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালকের কাছেও অভিযোগ দাখিল করেছেন।

প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, এবিএম জাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে আগেও অভিযোগ উঠেছিল। ২০২২ সালের ২৬ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল। তবে অজ্ঞাত কারণে সেই সময়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বহু বছর ধরে একই কর্মস্থলে বহাল রয়েছেন। অথচ সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী একই জায়গায় একটানা তিন বছরের বেশি কর্মরত থাকার সুযোগ নেই। শিক্ষক ও অভিভাবকরা মনে করছেন, দুর্নীতির নিরাপদ ক্ষেত্র তৈরি করতেই তিনি উজিরপুর ছাড়ছেন না।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক-শিক্ষিকা জানিয়েছেন, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আর্থিক লেনদেন ছাড়া কোনো নিয়োগ বা প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেন না। বিভিন্ন মিটিংয়েও শিক্ষকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করেন। নারী শিক্ষিকাদের তিনি একান্তে ডেকে এনে ব্যক্তিগতভাবে হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ আড়াল করতে তিনি প্রায়ই বলে বেড়ান যে তাঁর ছেলে সেনাবাহিনীর একজন মেজর পদমর্যাদার কর্মকর্তা।

এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা জানান, “বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। যথাযথ প্রমাণ পাওয়া গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হবে এবং তারাই এর উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন।”

স্থানীয়রা বলছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা রক্ষা ও দুর্নীতির দৌরাত্ম্যের লাগাম টানতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায় মেধাবী প্রার্থীরা বঞ্চিত হবেন এবং শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও কমে যাবে এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা বেড়ে যাবে।